একটা সময় মানুষের আবেগ বহুকেন্দ্রিক ছিলো। সেসময় আবেগের বিশাল একটি যায়গা জুড়ে ছিলো টেলিভিশন নামের ডিব্বা সাইজের একটি জড়বস্তু।
ব্রিটিশবিজ্ঞানী জন বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে প্রথম টেলিভিশন আবিষ্কার করেন এবং সাদা কালো ছবি দূরে বৈদ্যুতিক সম্প্রচারে পাঠাতে সক্ষম হন। এরও ১০ বছর পর প্রথম টিভি সম্প্রচার করে বিবিসি , এর পেছনে অবশ্য অবদান ছিল রুশ বংশোদ্ভুত প্রকৌশলী আইজাক শোয়েনবারগের।
বাংলাদেশে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম টেলিভিশন কেন্দ্র তৈরী করা হয়। এর প্রথম অনুষ্ঠানে সম্প্রচার করা হয়েছিলো এই যে আকাশ নীল হল আজ , শিল্পী ছিলেন ফেরদৌসি রহমান।
একটা সময় এই টিভি ছিল মোটামোটি উচ্চবিত্তদের ঘরের শোভাবর্ধনকারী বস্তু । যে বাসার ছাদে বাশের মধ্যে উচু করে এন্টেনা লাগানো থাকতো , মানুষ বুঝে নিতো সে বাসায় টিভি ওয়ালা মানুষ থাকে। সন্ধ্যার অনুষ্ঠান গুলোতে অনেকের ঘরের বৈঠকখানায় বসত পারা পরশীদের মিলনমেলা। তবে কিঞ্চিৎ অহংকারীরা আবার ঘরের দরজা জানালা লাগিয়ে টিভি দেখতো , কারন যেকোন সময় মশার সাথে সাথে কোন না কোন মানুষ হয়ত এসে পড়বে।
সে সময়ের টিভির অনুষ্ঠান দেখায়ও আনন্দ ছিলো অনেক। প্যারাও কম ছিল না। জোড়ে বাতাস উঠলেই টিভি দেখতে প্রব্লেম হতো । ঘরের কোন সদস্য ছাদে দিয়ে এন্টেনার বাশে ঝাকি দিয়ে চ্যানেল ঠিক করত।
দিন বদলের সাথে সাথে টেলিভিশন স্ক্রিনের রঙ ও বদল হলো , সাদাকালো থেকে হয়ে গেলো রঙ্গিন। ধিরে ধিরে দুর্লভ জিনিসটার দামও কমছে। অনেকের ঘরেই টিভি শোভা পাচ্ছে। বিয়ে গুলোতেও তখন জামাই পক্ষ সাইকেলের বদলে টিভি দাবি করা শুরু করে দিয়েছে। টিভি তখন লাইসেন্স করানো লাগতো । বর্তমানের মত সেই সময়ও গুজব উঠেছিলো । যাদের টিভিতে লাইসেন্স নাই তাদের টিভি নাকি পুলিশ বাসায় এসে খুলে নিয়ে যাচ্ছে। সাদাকালো টিভি ভেঙ্গে ফেলে রংগিন টিভি ট্রাকে করে নিয়ে যায়। আমাদের পাশের বাসার মানুষরা তাদের টিভি বক্স খাটের নিচে ঢুকায় রাখছিলো। ( আমাদের লাইসেন্স করানো ছিল , তাই লুকানো লাগে নাই ) তখন গুজব মানুষের মুখে মুখে একটু টাইম নিয়ে ছড়াতো এখনের মত হুটহাট করে ছড়াত না।
ডিশের লাইন এলো। টিভিও ঘরে ঘরে এসে গেলো। ডিব্বা সাইজের যন্ত্রটা যেখানে রুটিন করে পারা পরশিদের এক ঘরে নিয়ে আসত সেটা আর হলো না, ঘরের লোকজন নিজেদের ঘরের টিভি দেখে তখন। পুরো দুনিয়ার খবর একটা যন্ত্রের মাধ্যমেই পাওয়া যাচ্ছে । আহা কি আনন্দ।
দিন বদলের সাথে সাথে পরবর্তীতে টিভির সাইজও বদল হলো , সি আরটি থেকে ফ্ল্যাট টিভি , প্লাজমা, এলসিডি, এলইডি , কার্ভ , স্মার্ট টিভি , কতশত মডেল কতশত ব্র্যান্ড।
কোনটাই এখন আর ঘরের মানুষগুলোকে এক করে বসাতে পারে না।